Recommend to your friend:Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedInPin on PinterestPrint this pageEmail this to someone

শিরোনামটা অদ্ভুত।

বাস্তবে যা ঘটে চলেছে এবং ঘটতে চলেছে, তা আরও অদ্ভুত।

একটা সময়ে ব্রিটিশ রাজের যাবতীয় কুখ্যাত গুন্ডা-বদমাশদের নির্বাসনে পাঠানো হতো অস্ট্রেলিয়াতে। আর সেখানে এখন কারাগার এবং বন্দীদের জন্য আয়োজন করা হচ্ছে দুর্দান্ত সব ইভেন্ট !!! তবে ব্রিটিশ কলোণীর উপমহাদেশীয় অঞ্চলটাতে চিত্রটা সম্পূর্ণ উলটো। সংশোধনের জন্য তৈরী করা কারাগারগুলো যেন ভালো মানুষকেও ক্রিমিন্যাল বানিয়ে ছেড়ে দেয়।

মেলবোর্ন শহরের একটি কারাগারে স্বেচ্ছায় এক রাতের জন্য বন্দী হতে যাচ্ছেন প্রথিতযশা ১৮০ জন আইনজীবি। নামী দামী চেম্বারে কাজ করা এইসব ‘পশ’ আইনজীবিরা রাত কাটাবেন খুনী বা দুর্ধর্ষ অপরাধীদের সেলে, যেখানে ঐসব অপরাধীদের জীবনের গল্প শুনবার সুযোগ মিলবে তাদের। শুধু তাই নয়, কারাবন্দীদের জন্য এই মহাযজ্ঞে পরিবেশন করা হবে দামী খাবার, তাদের গান শোনাবে আইনিজীবিদের ব্যান্ড ‘লেক্স পিস্তলস’ (বিখ্যাত ব্যান্ড Sex Pistols এর অনুসরণে), যেখানে কিবোর্ড বাজাবেন অস্ট্রেলিয়া ক্রাইমস কমিশনের এক সদস্য, ব্যাস এবং লিড গিটারে থাকবেন দু’জন ব্যারিস্টার এবং ড্রামসে থাকবেন অস্ট্রেলিয়ান সুপ্রীম কোর্টের একজন বিচারপতি !!! আগামী ১০ই অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই প্রোগ্রামটি মূলত Youth Law নামক একটি সংস্থার ফান্ড রেইজিং ক্যাম্পেইন হিসেবে পরিচালিত হবে, যাদের মূল লক্ষ্য হলো পচিশ বছরের কমবয়সী দুঃস্থ মানুষদের আইনী সেবা প্রদান করা। (১)

RRRRRএর আগের বছর, ২০১৩ সালেও একই ধরণের ইভেন্টে ১৫০ জন আইনজীবি কারাগারে রাত কাটান !

কারাবন্দীদের উন্নয়ন এবং সংশোধন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করবার জন্য এই ধরণের উদ্যোগগুলোকে আমার কাছে স্বপ্ন মনে হয়। এবার আসুন আসুন দেখা যাক মুদ্রার অপর পিঠে কি আছে।

আলমগীর নামের এক অভাগা বাঙ্গালী তরুণের কথাই ধরা যাক। যে মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাতে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যায় দশ বছরের কারাদন্ড। কিন্তু তিনি ইতোমধ্যে বিনা বিচারেই ১২ বছর জেল খেটে ফেলেছেন, একটা বার জামিনও পাননি। অবশেষে গত ১৩ আগস্ট তিনি জামিন পান বিচারিক আদালত থেকে। জামিন আদেশে বলা হয়, এজাহারে আসামির নাম নেই। এ ছাড়া এজাহারভুক্ত আসামিরা বিভিন্ন সময় জামিন পেয়েছেন। দীর্ঘ এক যুগ চলে গেছে কিন্তু আসামি ১২ বছরের বেশি সময় জেলখানায় রয়েছেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস জেল কর্তৃপক্ষ লিগ্যাল এইড বা অন্য কোথাও বিষয়টি জানিয়েছে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ নেই। (২)

PRISON 01কিংবা ধরা যাক হারুণ নামক অভাগা তরুণটির কথা। এগারো বছর আগে যখন তাকে গ্রেফতার করা হয়, তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর। গরীব ভিখারী মায়ের সাধ্য ছিলো না কোন আইনী সহায়তার ব্যবস্থা করার, আর তাই বিনাবিচারে প্রায় এক যুগ জেল খেটে ফেলে অবশেষে এক এনজিও’র চেষ্টায় জামিন লাভ করতে সক্ষম হন তিনি। (৩)

মর্মান্তিক গল্পের নায়ক এই আলমগীর বা হারুণদের সংখ্যা অগণিত। আমাদের দেশের ৬৮টি কারাগারে মোট ধারণক্ষমতা ৩৪,১৬৭ জন, তবে বর্তমানে মোট বন্দী আছে ৬৫,৬৬২ জন, যা ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ। এদের মধ্যে প্রায় ৭০% বন্দীই আটক আছেন প্রি-ট্রায়াল বা বিচারাধীন অবস্থায়। সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক মামলাগুলোয় বন্দী বা নির্যাতিত মানুষগুলোর কথা নাই বা বললাম। (৪)

এটা ছাড়াও, কারাগারে বিনা বিচারে নিহত বন্দীদের সংখ্যাও আশংকাজনক। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এর হিসাবমতে, ২০১৪ সালের অগাস্ট মাস পর্যন্ত আট মাসে কাস্টোডিয়াল ডেথ বা কারান্তরালে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ২৯টি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এগুলোর কোন বিচার হয় না। (৫)

গত ৫ই সেপ্টেম্বর ভারতের সুপ্রীম কোর্ট একটা ঐতিহাসিক রায় দেয়, যেখানে বলা হয় একটা নির্দিষ্ট সময়ে বিনা বিচারে আটক থাকা বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। বিচারাধীন অবস্থায় সাজার অর্ধেক মেয়াদ পার হয়ে গেছে এমন বন্দিদের চিহ্নিত করতে সর্বোচ্চ আদালত জেলা বিচারকদের নির্দেশ দিয়েছেন। এ জন্য আগামী ১লা অক্টোবর থেকে বিচারকদের তাদের নিজ নিজ জেলার কারাগারে সপ্তাহে দু’বার পরিদর্শনে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ভারতে কারাগারে প্রায় ৪০ লাখ বন্দি রয়েছে, যা ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। এর মধ্যে তিন ভাগের দুই ভাগই বিচারাধীন মামলায় বন্দি। (৬)

PRISONআমাদের দেশে একম কোন সাহসী আইনজীবি কি আছেন, যিনি এইরকম একটা ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের জন্য আবেদন করতে পারেন? কিংবা কোন বিচারপতি?? অপর্যাপ্ত লিগ্যাল এইড বা প্রো-বোনো কাজকর্ম যা চলছে তা হয়তো মুখরক্ষার জন্য চলে, কিন্তু বিপুলসংখ্যক বিচারপ্রার্থী মানুষ জন্য বিশেষত যারা বিনা অপরাধে বিনা বিচারে দিনের পর দিন পার করছেন কারাগারে, তাদের জন্য এটা নিছক তামাশা বৈ আর কিছুই না।

বিনাবিচারে কারাগারে ধুঁকে মরা একজন নিঃস্ব মানুষকে জামিন বা মুক্ত করে আনাটা সম্ভবত খুব বেশি কঠিন কোন কাজ না। সাধারণ হতদরিদ্র মানুষের আইন সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব, যথাযথ পথঘাট না চেনা কিংবা কোন উপায়ন্তর করতে না পারাই হয়তো এর মূল কারণ। তবে এটা ঠিক যে এই ধরণের কাজগুলোর মধ্যে কোন গ্ল্যামার নেই, সম্মান নেই এবং মোস্ট ইম্পরট্যান্টলি, টাকা তো নেইই।

তবে বিশ্বাসী মানুষ হিসেবে একজন অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর বিষয়টিকে নেহায়েত তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দিতে পারি না।

তাই, একজন সাহসী আইনযোদ্ধার প্রত্যাশায় আছি !!!

রেফারেন্সঃ

(১) bit.ly/1pSQdoH

(২) bit.ly/1xO3XLv

(৩) bit.ly/1sscEGR

(৪) bit.ly/1rNibUp

(৫) bit.ly/1uoKw8n

(৬) bit.ly/1rXWmYa

Comments

comments